রোববার   ২১ জুলাই ২০২৪   শ্রাবণ ৬ ১৪৩১

না.গঞ্জে বাড়ছে প্রকাশ্যে নৃশংসতার ঘটনা

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ৩ জুলাই ২০২৪  

 

 

# গত এক মাসেই চারটির বেশি প্রকাশ্য খুন
# সাত খুনের প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ন্যয্য বিচার হলে এদের বিরুদ্ধে কেন হবে না : দিপু
# আসামীদের জামিন না পাওয়া ও দ্রুত শাস্তি হলে কিছুটা কমতো বলে দাবি
# প্রশাসন ও আইনজীবীদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ

 

প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া, রাস্তা বা গলির মাঝখানে প্রকাশ্যে খুন, বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে খুন, আবার কাউকে দেখা যাচ্ছে প্রকাশ্য দিবালোকে বাড়ির ভিতরের ঘর থেকে টেনে নিয়ে বাড়ির উঠোনে পিটিয়ে খুন করার দৃশ্য। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এধরণের চিত্র প্রায় হরহামেশাই দেখা যাচ্ছে। এসব ঘটনার বেশিরভাগই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটছে বলে স্থানীয়দের দাবি। 

 

যার মধ্যে স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার, ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখা কিংবা মাদক ও বিভিন্ন সিন্ডিকেটের টাকা ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ঘটছে বলে অভিযোগ আছে। তাছাড়া সামান্য কিছু টাকার লোভে অটো ড্রাইভারকে হত্যা, সামান্য টাকা দেনা-পাওনা নিয়ে হত্যা এমনকি বিভিন্ন তুচ্ছ ঘটনা নিয়েও হত্যা বা খুন করার ঘটনা এখন অহরহ ঘটে যাচ্ছে। যা নারায়ণগঞ্জের এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

 

স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনায় আসামীদের জামিন পাওয়া কষ্টসাধ্য করা হতো, যতটা সম্ভব দ্রুত সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তাদের দৃষ্টান্তুমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যেত, পুলিশ প্রশাসন তাদের ভূমিকা বা দায়িত্ব পালন করতেন এবং মামলার আসামী পক্ষের আইনজীবীরা তাদের দায়িত্ব পালনে আরও একটু সচেতন হতেন তাহলে হয়তো এরকম বেপরোয়াভাবে প্রকাশ্যে হত্যা বা খুনের ঘটনা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো।

 

নারায়ণগঞ্জের বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনা শুধু নারায়ণগঞ্জই নয়, দেশ ও দেশের বাহিরেও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যার মধ্যে ২০১৪ সালের এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত সাত খুনের ঘটনাটি ছিল খুবই উল্লেখ্য যোগ্য। যাতে সাতজন ব্যক্তিকে প্রথমে জোরপূর্বক গুম এবং শেষ পর্যন্ত হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের একজন প্যানেল মেয়র এবং একজন আইনজীবীও রয়েছেন। 

 

এই ঘটনায় দেশের প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন জড়িত থাকার পরও দোষী সাব্যস্ত আসামীদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ শাস্তির বলবৎ আছে (যদিও এখন পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি)। একই সাথে শহরের বাবুরাইলে ঘটিত একই পরিবারের ৫ সদস্যকে জবাই করে হত্যার বিষয়টিও কম আলোচিত হয়নি। সেই ঘটনার আসামীর বিরুদ্ধেও সর্বোচ্চ শাস্তি বলবত আছে বলে জানা গেছে। 

 

অবশ্য নারায়ণগঞ্জের আরও একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড হলো নারায়ণগঞ্জে মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ড। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ তার ছেলে ত্বকী শায়েস্তা খান সড়কের বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি। ৮ মার্চ সকাল পৌনে ১০টায় শহরের চারারগোপের শীতলক্ষ্যা নদী সংলগ্ন খাল থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করা হয়। সেই হত্যাকাণ্ডের এখন পর্যন্ত কোন সুরাহা হয়নি বলে তার প্রতিবাদ করে যাচ্ছেন ত্বকীর পরিবার ও স্বজনেরা। তবে বর্তমানের একের পর এক যে ধরণের প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বাড়ছে, তা খুবই আশঙ্কাজনক বলে মনে করছেন নারায়ণগঞ্জবাসী।

 

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী শুধুমাত্র গত একমাসেই (জুন মাসে) কমপক্ষে ৪/৫টি প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটেছে। যেগুলো ছিল ফিল্মি স্টাইলে এবং প্রকাশ্য জনসমুখ্যে। যার মধ্যে গত ২৭ জুন ফতুল্লায় সুরুজ মিয়া নামের আওয়ামী লীগের এক নেতাকে দিনের বেলায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, গত ২৫ জুন শহরের মণ্ডলপাড়ায় নাসির নামের এক হোসিয়ারি শ্রমিককে সন্ধ্যা আটটার দিকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, 

 

গত ৯ জুন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে রাত ১০টার দিকে ফজলে রাব্বী নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা ৭ জুন বন্দর উপজেলার মদনপুরে পূর্বশত্রুতার জের ধরে মনিরুজ্জামান মনুকে ঘর থেকে তার পরিবারের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে মাথায় গুলি করে এবং প্রকাশ্যে লাঠিপেটা করে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনা উল্লেখ্যযোগ্য।  

 

এর আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় আল আমিন দানিয়াল নামে ফতুল্লার এক যুবককে প্রকাশ্যে এক যুবককে কুপিয়ে আহত করে অটোরিকশায় তুলে নিয়ে তাদের বাড়ির সামনে যায় এবং আবার আঘাত করে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক দানিয়ালকে মৃত ঘোষণা করেন। গত ২৫ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সোনারগাঁয়ের জামপুর ইউনিয়নের মাঝেরচর এলাকায় একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নজরুল ইসলাম ভূইয়া নামের এক যুবলীগ নেতাকে পিটিয়ে হত্যা করে সিএনজি চালক ও স্ট্যান্ডের লোকজন। 

 

নিহত নজরুল নোয়াগাঁ ইউনিয়ন যুবলীগের সহ-সম্পাদক। এসব ঘটনার বাইরেও এই বছরের গত কয়েকমাসে নারায়ণগঞ্জে বেশ কয়েকটি রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। যার মধ্যে ইজিবাইক চালকদের হত্যা করে তাদের গাড়ি লুট করে নেওয়া, মাদক ও বালু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণসহ স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার লাভ করাকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংদের দৌরাত্ম বৃদ্ধি। 

 

এদের মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সন্ত্রাসীরা ১০/১৫ জন থেকে শুরু করে ২০/৩০ জনের একটি গ্রুপ তৈরি করে এলাকায় একটি ত্রাসের সৃষ্টি করে মানুষজনকে আতঙ্কের মধ্যে রেখে প্রকাশ্যে হত্যা করাসহ তাদের বিরুদ্ধে মুখ না খোলার সংকেত দিয়ে যায়। ঘটনার পর এদের বেশিরভাগ আসামীই প্রকাশ্যে ঘুরাফেরা করার অভিযোগ থাকলেও প্রশাসনের কাছে তারা পলাতক বা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে মন্তব্য এবং এই একই অভিযুক্তরা পরে আরও অপরাধ করার প্রবণতা দেখাচ্ছে।

 

এই বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য এডভোকেট আনিসুর রহমান দিপু যুগের চিন্তাকে বলেন, এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তব্য পালনে ঘাতটি, বিভিন্ন জায়গায় মাদক, চাঁদাবাজির আধিপত্য ও ভূমিদস্যুদের আধিপত্য প্রভাবের কারণে এই ঘটনাগুলো ঘটতেছে। এখানে কিশোরগ্যাং নামেরও একটি বিষয় আছে। 

 

এইসব বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণের বিষয় নিয়ে একটি গ্রুপ সন্ত্রাসের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এখানে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দুর্বলতা, জনপ্রতিনিধিদের দুর্বলতা ও প্রশাসনের দুর্বলতা তারা সঠিকভাবে এটা হেন্ডেলিং (নিয়ন্ত্রণ) করতে পারতেছে না। অনেকেই নিজেদের প্রয়োজনে একটি গ্রুপ পালতেছে এবং তাদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য অন্য গ্রুপের উপর আক্রমণ করতেছে। এরফলে যে হত্যাকাণ্ড ঘটতেছে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন কারণেই কেউ কথা বলার সাহস পাচ্ছে না। 

 

যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি ব্যর্থতাও আছে। সাত খুনের মামলার আসামীরা অত্যন্ত প্রভাবশালী থাকা সত্ত্বেও কিন্তু আমরা তার বিচার করতে পেরেছি। তাদের বিচার যদি হতে পারে তাহলে এসব খুনিদের বিচার কেন হতে পারবে না। দু’একজন খুনিকে ধরে যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া যেত তাহলেও মনে হয় এই ঘটনা অনেকটা কমে যেত।

 

তিনি বলেন, এধরণের ঘটনায় যদি শক্ত এভিডেন্স উপস্থাপন করা যায়, তাহলে আসামী কেন জামিন হবে। সেখানে আইনের দুর্বলতা ও এজাহারের দুর্বলতাসহ বিভিন্ন দুর্বলতার কারণে এই সুযোগটা আইনজীবীরা নেয়। একটি প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড ঘটছে মানুষ ভিডিও ফুটেজ দিচ্ছে, তারপরও দেখা যাচ্ছে অনেক আসামীকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বাংলাদেশের অনেক বড় বড় অপরাধের সুরাহা করেছে। তাহলে এদের খুঁজে পাওয়া যাবে না কেন, অপরাধীরা জামিন পাবে কেন? 

 

আমরা দেখেছি এখানে একটি এজাহার লিখতে গেলে ইচ্ছে করেই ফাঁকফোকর রেখে দেয়। অনেক সময় দেখা যায় কোন একটি ঘটনায় যারা অপরাধী তাদের নামতো দেওয়া হয়ই, এরসাথে কিছু নিরাপরাধ ব্যক্তির নামও দেওয়া হয়, যদিও বিষয়টি সবক্ষেত্রে না। সেক্ষেত্রে দেখা যায় আসল আসামীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু কিছু নিরাপরাধ ব্যক্তিকে আটক করে নিয়ে আসা হচ্ছে। 

 

তিনি আরও বলেন, এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিৎ দ্রুত আসামীকে গ্রেফতার তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিব্যক্তি মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বার কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রভাব বা তাদের রিকোয়েস্টের কারণে মামলায় শেষ পর্যন্ত আপোষ করতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে সবাই যে ব্যক্তিকে খুনি হিসেবে জানে, সে বেকসুর খালস পায় এবং গায়ে ফুঁ দিয়ে বেড়ায়। যার ফলে অন্য অপরাধীরাও উৎসাহিত হয়।

এই বিভাগের আরো খবর