বৃহস্পতিবার   ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪   ফাল্গুন ১০ ১৪৩০

আইভীতে নাখোশ বামজোট

ইউসুফ আলী এটম

প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪  

 

২০০৩ সাল থেকে টানা ২১ বছর বাম ঘরানায় আবদ্ধ ছিলেন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। অবশ্য ছাত্রজীবন থেকেই বাম রাজনীতির সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিলো বলে চাউর আছে। ছাত্রী হিসেবে যে তিনি খুব একটা ভালো ছিলেন, এমনটি বলা যায় না। তবে অনেক চেষ্টা তদবির করে বাম ছাত্রসংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সুপারিশে তিনি স্কলারশিপ নিয়ে তৎকালীন কমিউনিস্ট শাসিত রাষ্ট্র রাশিয়া যেতে সমর্থ হয়েছিলেন বলে নারায়ণগঞ্জ ছাত্র ইউনিয়নের একজন সাবেক নেতা জানান।

 

এবং রাশিয়ার ওডেসা পিরাগোব মেডিকেল ইনস্টিটিউট থেকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ১৯৯২ সালে তিনি ডক্টর অব মেডিসিন ডিগ্রী লাভ করেন। আর এ কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই বামদের প্রতি তার একটা প্রচ্ছন্ন সহানুভূতি সবসময়ই কাজ করতো। কিন্তু গত ৩ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের উদ্যোগে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সফল গোলটেবিল বৈঠক বাম শিবিরে প্রচন্ড আঘাত হানে।

 

আইভীর জাতশত্রু শামীম ওসমানের সাথে গোলটেবিলে পাশাপাশি বসা, একটেবিলে বসে খাওয়া-দাওয়া করা, হেসে হেসে কথা বলা, এসব দৃশ্য খুব সহজে হজম করতে কষ্ট হয় বাম নেতাদের। তবে কি আইভী তাদের হাতছাড়া হয়ে গেলো, এমন একটা শঙ্কা বাম ঘরানার নেতাদের কাঁধে জেঁকে বসে। আর তখন থেকেই আইভীর প্রতি নাখোশ বামজোট।   

 

প্রসঙ্গত, ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই বাজিমাত করেন আলী আহম্মদ চুনকা তনয়া ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। টানা ৮ বছর পৌর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের পর ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন গঠিত হলে তিনি টানা ৩ বার মেয়র নির্বাচিত হয়ে রেকর্ড গড়েন। ২১ বছর যাবৎ তিনি ক্ষমতার নরম গদিতে আসীন আছেন। আর এই দীর্ঘটা সময়ই তিনি বামবলয়ে বন্দি ছিলেন।

 

বামদের কথায় তাকে ওঠবস করতে হতো। নানা কৌশলে বামনেতারা তাকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকান্ড থেকে দূরে সরিয়ে রাখতেও সক্ষম হন। তার এই অতিরিক্ত বামপ্রীতির কথা এক কান দু’কান হয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রে পৌঁছে যায়। একটা সময় আওয়ামী লীগ থেকেই তার ছিটকে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। কিন্তু তার ওপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেকজর থাকায় তাকে দলীয় পদ হারাতে হয়নি বলে গুঞ্জন রয়েছে।

 

বলা হয়ে থাকে, এ কারণে ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাকে মনোয়ন না দিয়ে শামীম ওসমানকে সমর্থন দেয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার করুণা না পেলে ‘আইভী চ্যাপ্টার’ ওখানেই চিরদিনের জন্য মাটিচাপা পড়ে যেতো বলে মনে করেন তার বিরোধীপক্ষ।

 

কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বেগম জিয়ার চট্টগ্রামমুখী লংমার্চ চিটাগাংরোডে ঠেকিয়ে দিয়ে শামীম ওসমান তার জাতশত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন। তাই শামীম ওসমানের বিজয় ঠেকাতে তিনি আইভীকে সমর্থন দিয়ে তার নিজ দলের প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারকে কোরবানী দিতেও বিন্দুমাত্র চিন্তা করেননি।

 

সেদিন বিএনপি ও জামায়াতের বিশাল ভোটব্যাংক আইভীর বাক্সে ঢুকিয়ে শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিয়ে তৃপ্তির ক্রুর হাসি হেসেছিলেন ম্যাডাম জিয়া। মুুখে প্রকাশ না করলেও আইভী ঠিকই উপলব্ধি করেন, তিনি তৈমূর খন্দকারের অশ্রু মাড়িয়ে ও বেগম খালেদা জিয়ার আশীর্বাদ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হতে পেরেছিলেন। 

 

এর বদলাও দিয়ে আসছেন তিনি। বগম খালেদা জিয়ার স্নেহের পাত্রী হয়ে মেয়র আইভী নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলরদের প্রতি সুদৃষ্টি রাখতেও কোন কৃপণতা দেখাননি। তবে জীবনের প্রথম উত্থান যাদের হাত ধরে সেই বাম ঘরানার নেতাকর্মীরা আজও তার নেকনজর থেকে বঞ্চিত হননি।

 

কিন্তু প্রেসক্লাবের গোলটেবিল বৈঠক বামজোটকে হতাশায় ফেলে দিয়েছে। শহরের উত্তর এবং দক্ষিণমেরুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধের অবসান না চেয়ে যারা এটিকে জিইয়ে রাখতে চেয়েছিলেন সেই বাম ঘরানার নেতাকর্মীরা আইভীর প্রতি নাখোশ হবেন, এটাতো জানা কথা। তবে সময় গড়ানো শুরু হলেই বুঝা যাবে, কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে ঠেকে! এস.এ/জেসি
 

এই বিভাগের আরো খবর